জাকির আহমদ খান কামালঃ সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদে উঠে এসেছে, ভুয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদের মাধ্যমে চাকরি পাওয়া ৬৭৬ জন শিক্ষককে পুনরায় যাচাই করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে জাল সনদ তৈরি করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার পরিচয় নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
শিক্ষকতা একটি মহান ও দায়িত্বশীল পেশা। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না; তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও দেশপ্রেম গঠনের কারিগর। সেখানে যদি জাল সনদের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তি শিক্ষকতার সুযোগ পান, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো জাতিকেই বহন করতে হয়। একজন অযোগ্য শিক্ষক হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেন।
ভুয়া সনদের বিস্তার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় জাল সনদ, জাল অভিজ্ঞতা ও প্রতারণার অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। এসবের পেছনে অসাধু চক্র, দুর্বল যাচাই-বাছাই ব্যবস্থা এবং কখনো কখনো প্রশাসনিক উদাসীনতা কাজ করে। প্রযুক্তির এই যুগে যেখানে অনলাইনে সনদের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব, সেখানে এমন প্রতারণা ঘটতে পারা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তবে বিষয়টির ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে পুনরায় যাচাই কার্যক্রম শুরু হওয়া প্রমাণ করে যে সরকার অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী। কিন্তু শুধু কয়েকজনকে শনাক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যেসব প্রতিষ্ঠান ভুয়া সনদ তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যারা জেনেশুনে এসব সনদ ব্যবহার করে চাকরি নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম ঠেকাতে নিয়োগের প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন, সনদের ইউনিক নম্বর এবং কেন্দ্রীয় অনলাইন ডাটাবেজের মাধ্যমে মুহূর্তেই সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। এতে জালিয়াতির সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।
এ কথাও মনে রাখতে হবে, হাজারো সৎ ও যোগ্য শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কয়েকজন প্রতারকের কারণে পুরো শিক্ষক সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করা অন্যায়। তাই তদন্তে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে, যাতে নির্দোষ কেউ হয়রানির শিকার না হন।
একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে যোগ্য ও সৎ শিক্ষকের ওপর। সেখানে ভুয়া সনদের কোনো স্থান নেই। শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।
রাষ্ট্র যদি এখনই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে শুধু এই অনিয়মেরই অবসান হবে না,ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সম্ভব হবে মনে করি।
জাকির আহমদ খান কামাল, কলামিস্ট।

