এইচ রহমান: একুশে ফেব্রুয়ারি—যে দিনটি আমাদের অহংকারের, আমাদের অস্তিত্বের। সারা জাতি যখন পরম শ্রদ্ধায় আর বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে ভাষা শহীদদের স্মরণে নগ্ন পায়ে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করছে, তখন নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার দাঁড়িয়ে আছে এক বুক হাহাকার আর অবহেলা নিয়ে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যে বেদিতে আমাদের আবেগ আর বর্ণমালা মিশে থাকার কথা, সেই শহীদ মিনারের মূল স্তম্ভগুলো আজ শ্যাওলার কালচে আস্তরণে ঢাকা। যেন অযত্নের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় চেতনার প্রতীকটি।
সারা বছর তো বটেই, একুশের এই বিশেষ প্রহরেও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণটি ছিল নিস্তব্ধ। শহীদ মিনারের এই দশা দেখে উপস্থিত অনেকের চোখেই দেখা গেছে ক্ষোভের জল।
অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা প্রশাসন কেবল গুটিকয়েক পোস্টার আর দায়সারা আনুষ্ঠানিকতা দিয়েই তাদের কর্তব্য শেষ করেছে, সংস্কারের কোনো ছোঁয়া লাগেনি এই স্তম্ভে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—যে ভাষায় আমরা কথা বলি, যে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি, সেই ভাষার স্মৃতিস্তম্ভকে এভাবে শ্যাওলার দখলে যেতে দেওয়া কি আমাদের চরম নৈতিক পরাজয় নয়?
একুশের প্রথম প্রহরে যেখানে মানুষের ঢল নামার কথা, সেখানে রাত পৌঁনে ১টা পর্যন্ত মাত্র তিনটি সংগঠন—পূর্বধলা রিপোর্টার্স ক্লাব, রাজপাড়া স্পোর্টিং ক্লাব এবং স্বর্ণ সুধা যুব উন্নয়ন সমিতিকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে দেখা গেছে। একটি উপজেলা সদরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই নিস্তব্ধতা আর সীমিত উপস্থিতি যেন শহীদদের প্রতি আমাদের অবজ্ঞারই এক নীরব বহিঃপ্রকাশ।
স্থানীয় বাসিন্দারা আক্ষেপ করে বলেন, যদি ভাষা আন্দোলনের এই অমর স্মৃতিচিহ্নকেই আমরা রক্ষা করতে না পারি, তবে নতুন প্রজন্মকে কীভাবে দেশপ্রেমের শিক্ষা দেব?
স্থানীয় গণমাধ্যমের নীরবতাও এখানে বিঁধছে তীরের মতো; এমন অব্যবস্থাপনা নিয়ে কেন কোনো জোরালো আওয়াজ নেই—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বইছে সমালোচনার ঝড়।
স্থানীয় জুয়েল মিয়া বলেন, শহীদ মিনারের গায়ে জমা হওয়া শ্যাওলা কেবল কিছু পরজীবী উদ্ভিদ নয়, এটি আমাদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা আর জাতীয় অবহেলার এক কলঙ্কিত দলিল। ভাষার এই পরম স্মারকটি কি এভাবেই অযত্নে বিলীন হয়ে যাবে, নাকি আমাদের বিবেক জাগ্রত হবে?